ফ্যামিলি কার্ড, আসলেই কি কার্যকরী নাকি পলিটিকাল পপুলিজমের গিমিক মাত্র?
প্রথমেই বলে নেই আমার জ্ঞানের স্বল্পতা খুবই অল্প। অর্থনীতির ছাত্র হলেও আমি সেই এখনো ছাত্রই। তবে ডেবেলপমেন্ট ইকোনমিক্স এর এই বিষয় গুলোতে আগ্রহ থাকার কারণে এই একটু আধটু ঘাটাঘাটি করতে পছন্দ করি এই আরকি। তাই এখানে যা কিছুই লিখছি, সবগুলোই বিভিন্ন পেপার থেকে নেওয়া, আমার নিজের লেখা বা এসামশন কিছুই না। বিভিন্ন রিসার্চ পেপার ঘেঁটে নিজে যা বুঝলাম তাই সহজ ভাষায় লেখা (কঠিন ভাষায় লেখার যোগ্যতা অর্জন হয়নি এখনো)
বিএনপির এবং তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারের সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি ছিলো তা হলো ফ্যামিলি কার্ড। মোট কথায় এর অর্থ হলো দেশের হত দরিদ্র, দরিদ্র এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলা সদস্যের আড়াই হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা প্রদান যা সরকার বহন করবে। এটি নতুন কোন বিষয় না। ইকোনমিক্স এর ভাষায় একে বলা হয় Unconditional Cash Transfers (UTC), অর্থাৎ বিনা শর্তে অর্থ প্রদান। আরেক ধরনের Cash Transfer রয়েছে যেটিকে বলা হয় Conditional Cash Transfers (CCT), নাম শুনেই বুঝতে পারছেন, এর সাথে কোন একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়( টাকাটি শিক্ষা বা স্বাস্থ্যে ব্যায়) । বিশ্বের অন্তত ১৩০টির ও বেশি উন্নয়নশীল দেশে বিভিন্ন ধরনের ক্যাশ ট্রান্সফার প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। হয় সরকার কর্তৃক না হয় এনজিও কর্তৃক। এর মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট বৃদ্ধি (অর্থাৎ এই টাকা যদি বাচ্চাদের শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয় তাহলে সেটি দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলবে।) ইত্যাদি।
এখন অনেকের মধ্যেই যে প্রশ্নগুলো আসতে পারে তা হল, "এই অল্প টাকাগুলো মানুষের মধ্যে বিলি করে লাভটাই বা কি?" "এই অল্প টাকা কি কাজে আসবে, এই টাকা তো সরকার জনগণের কাছ থেকেই নিবে তাইলে?" "এসব কোন কাজের না , শুধু ভোট পাওয়ার জন্যই বলা", ইত্যাদি। লাভের হিসাবে একটু পরে আসছি, প্রথমেই UCT র যে নেগেটিভ দিক গুলো রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
সবার আগে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রবলেম ক্রিয়েট করতে পারে তা হলে Fiscal Burden, অর্থাৎ সোজা বাংলায় এই প্রোগ্রামটির পরিধি যদি বড় হয়, তাহলে এটি বাজেটের একটি ভালো অংশই খরচ করবে। যেটি ছোট অর্থনীতির দেশ গুলোর জন্য ভালো সমস্যা বয়ে আনতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এভাবে ফ্রি তে টাকা পেতে থাকলে, Labour Participation কম হতে পারে, কম মজুরির শ্রমিকরা হয়তো ভাবতে পারে যে, কাজের ঘন্টা কমিয়ে দিলেও হবে, ওই পরিমাণ টাকা তো পাচ্ছি। (যদিও গবেষণায় এর উল্টো দেখা গিয়েছে)
এবং লাস্ট বাট নট দ্যা লিস্ট, ভোটের জন্য মিথ্যা ওয়াদা করা বা পলিটিকাল পপুলিজম পাওয়ার জন্য এসবের ফাউ বুলি আওরানো। (অলরেডি এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা একটি ভালো লক্ষণ। যদি এভাবে চলতে থাকে তাইলে আমাদের ক্ষেত্রে এই আর্গুমেন্টটি নাকচ করে দেওয়া যায়)।
এখন কথা বলা যাক এর কর্যকারিতা নিয়ে, এটি কি আসলেই কার্যকরী? বা কতটুকুই বা লাভজনক একটি দেশের অর্থনীতির জন্য? কেনই বা অনেক অর্থনীতিবিদ এটিকে সমর্থন করে? একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
অনেকে ভাবতে পারেন গরিবরা এই টাকা টা ভালোভাবে ব্যবহার না করে অপচয় করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা খরচের ক্ষেত্রে বেশি Rational (নিজের ব্যক্তিগত উপযোগ, সন্তুষ্টি বা স্বার্থকে সর্বাধিক করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া)। তারা অতিরিক্ত অর্থ পেলে সেটি অপচয় না করে বরং খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ছোটখাটো বিনিয়োগে ব্যবহার করে। আর UCT র প্রক্রিয়া সহজ, এবং ঝামেলাহীন, যা সহজেই গরিব ফ্যামিলিগুলোর Liquidity Constraints বা অর্থ স্বল্পতা দূর করতে পারে। তাই অনেক অর্থনীতিবিদ এটির পক্ষে কথা বলে।
দারিদ্র্য বিমোচনের এর ভূমিকা, অনেকের কাছেই এই টাকাটা সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই সামান্য টাকার ও একটি বাটারফ্লাই ইফেক্ট রয়েছে। এই টাকাটা যদি ভালো খাবারে ব্যবহার করা হয় তাহলে ওই পরিবারের শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পাবে এবং স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে, স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে এরা পড়াশোনায় ভালো করবে আর পড়াশোনায় ভালো হলে রাষ্ট্রের জন্য একটি সম্পদ তৈরী হবে। এই বিষয়ে J-Pal (Abdul Latif Jameel Poverty Action Lab) এর একটি রিসার্চ পেপার পেলাম, “The Long-Term Impact of Unconditional Cash Transfers: Experimental Evidence from Kenya”(লিংক কমেন্টে দেওয়া)। এই স্টাডিটি Randomised Controlled Trial (RCT) এর ব্যবহার করে করা। (RCT সম্পর্কে একটু ধারণা দেওয়া যাক। বিস্তারিত যাচ্ছি না, তবে এটি এক ধরনের সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন যা কোন পলিসি কাজ করছে কিনা তা জানার খুবই কার্যকরী একটি পদ্ধতি। দারিদ্র্য নিরসনে এই RCT এর ব্যবহারে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার জন্যই ২০১৯ এ অভিজিৎ ব্যানার্জি, এস্তার দুফলো ও মিশেল ক্রেমারকে অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়া হয়)। এই গবেষণার রেজাল্ট বা ফাইনাল ফাইন্ডিং খুবই ইতিবাচক। কেনিয়ায় দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর Unconditional Cash Transfer (UCT) এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেলো, যে পরিবারগুলো গড়ে প্রায় $709 (PPP) অর্থ সহায়তা পেয়েছিল, তিন বছর পরে সেই পরিবারগুলোর সম্পদের পরিমান প্রায় ৪০% বেশি এবং ভোগব্যয় প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা এই অর্থ ব্যাবহার করেছে গবাদিপশু কেনা, ঘরের উন্নয়ন ও সঞ্চয়ের মতো বিনিয়োগে, যা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা খাতে ব্যয় এবং মানসিক সুস্থতায়ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়, স্ট্রেস ও হতাশাও কমেছে। তাছাড়া, ১১৫টি স্টাডিজ এর একটি মেটা অ্যানালাইসিস থেকেও দেখা যায় যে, UCT, ইনকাম এবং ভোগব্যায় দুটিই বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসা, ঘরের সম্পদের বৃদ্ধি ইত্যাদি এসবের কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতেও একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
নারীর ক্ষমতায়নে এর ভূমিকা, এই বিষয়ে দুটি রিসার্চ পেপার পেলাম, কমেন্টস এ লিংক দেওয়া আছে। দুটিই পাকিস্তানের। প্রথমটি হলো, "A qualitative evaluation of the impact of cash transfer programs on women’s empowerment" by Mudassira Sarfraz। এটির মেইন অবজেক্টিভ, Benazir Income Support Programme (BISP), যা একটি UCT প্রোগ্রাম কিভাবে নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখে তা বের করা। এটির মেথডলজি Qualitative Approach, একটি ফোকাস গ্রুপ, ৫ জন বেনিফিশিয়ারি, ৪ জন নন বেনিফিশিয়ারির ইন্টারভিউ থেকে ডাটা নেওয়া। এত ডিটেইলসে যাচ্ছি না তবে মূল ফাইন্ডিং ছিলো UCT ইতিবাচক প্রভাবই ফেলে, মহিলাদের হাতে কিছু টাকা আসায় তাঁরা নিজের মতো করে খরচ করতে পারা, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর খরচ বহন করতে পারা, এবং টাকা থাকায় পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ততে অংশ নেওয়া, পরিবারে এবং সমাজে সম্মান বৃদ্ধি পাওয়া এসব পজেটিভ ইম্পেক্ট। কিন্তু Patriarchal Norm গুলো বহাল রয়েছে। একই বিষয়ে আরেকটি পেপার রয়েছে, তাও BISP এর উপরই, “Unconditional Cash Transfer Program and Women’s Empowerment: Evidence from Pakistan”টাইটেলের এই পেপারটি অমর্ত্য সেন এর capability approach (অমর্ত্য সেন এর মতে, নারীর ক্ষমতায়ন মানে হলো তাদের নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, অর্থাৎ এমন সুযোগ তৈরি হওয়া যাতে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো জীবন যাপন করতে পারে) এবং নাইলা কবির এর empowerment framework (এই ধারণাটিকে আরও বিস্তৃত করে বলেন, ক্ষমতায়ন মূলত “পাওয়ার” বা শক্তির সাথে যুক্ত, যা বোঝায় নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা) এর উপর ভিত্তি করে লেখা। ৬৪৪৭ জনের ডেটা নিয়ে করা এই গবেষণাটির ও ফাইন্ডিং আগেরটির মতোই, অর্থাৎ self empowerment, familial empowerment, economic empowerment এ পজেটিভ ইম্পেক্ট দেখতে পাওয়া। তাই মোটামুটি বলা যেতে পারে নারীর ক্ষমতায়নে এটি একটি ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।
এবার আসা যাক, আসলেই কি UCT দরিদ্র মানুষকে কম কাজে উৎসাহিত করে? এই বিষয়ে অভিজিৎ ব্যানার্জির করা একটি রিসার্চ পেপার পেলাম, "Debunking the Stereotype of the Lazy Welfare Recipient: Evidence from Cash Transfer Programs"। এটির মূল সারমর্ম হলো এই ধরনের কোন সিস্টেমেটিক এভিডেন্স পাওয়া যায়নি যা প্রমাণ করে যে Cash Transfers এর কারণে Labour Supply কম হয়। এই গবেষণায় মূল বিষয়ই ছিলো, নগদ অর্থ সহায়তা (cash transfer) কি দরিদ্র মানুষকে কম কাজ করতে উৎসাহিত করে কিনা তা দেখা। অনেকের ধারণা, এই ধরনের সহায়তা মানুষকে অলস এবং অনুৎসাহিত করে তোলে, কিন্তু বিভিন্ন দেশের সাতটি Randomized Controlled Trial (RCT) বিশ্লেষণ করে দেখা গেলো যে এই ধারণার পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নগদ সহায়তা পাওয়ার পরেও মানুষের কাজের হার বা কাজের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাই না। গড়ে কর্মসংস্থানে মাত্র ০.৪% হ্রাস এবং সপ্তাহে প্রায় ৫ মিনিট কম কাজের মতো খুবই ছোট পরিবর্তন দেখা যায়।
এই পেপারে আরো দেখা যায় যে, এই সহায়তা মানুষকে কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য না করে বরং অনেক ক্ষেত্রে ছোট ব্যবসা বা উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োগে সাহায্য করে। এর একটি কারণ হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই প্রোগ্রামগুলোর যোগ্যতা সরাসরি আয়ের ওপর নির্ভর করে না, ফলে বেশি কাজ করলে সহায়তা হারানোর ভয় কম থাকে। এছাড়া সহায়তার পরিমাণ সাধারণত এত কম যে তা দিয়ে পুরো জীবিকা নির্বাহ সম্ভব নয়, তাই মানুষ কাজ চালিয়ে যায়।
সব মিলিয়ে, গবেষণাটি প্রমাণ করে যে নগদ অর্থ সহায়তা মানুষকে অলস করে, এই ধারণাটি মূলত একটি ভ্রান্ত ধারণা। বরং এই ধরনের কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর এবং উন্নয়নশীল দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা নীতি হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, এটির সঠিক বাস্তবায়ন। যদি আমাদের দেশে এই কর্মসূচি স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়, দুর্নীতি না হয়(বিএনপির আগের রেকর্ড, আর এবার মন্ত্রী আর গর্ভনর নিয়োগ সেই ভরসাটা দিতে পারছে না), এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে অর্থ পৌঁছায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
আমার বাংলা-ইংরেজি, সাধু-চলিত এসব গুরুচন্ডালী দোষ ক্ষমা করবেন।
ইফতেখার উদ্দিন
৩য় বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়
https://www.povertyactionlab.org/sites/default/files/research-paper/The-long-term-impact-of-conditional-cash-tranfer_Kenya_Haushofer_Shapiro_January2018.pdf
https://voxdev.org/topic/social-protection/what-broad-lessons-have-we-learned-115-studies-unconditional-cash-transfers
https://link.springer.com/article/10.1007/s11135-025-02543-7
https://link.springer.com/article/10.1007/s00181-024-02626-8
https://academic.oup.com/wbro/article-abstract/32/2/155/4098285?redirectedFrom=fulltext


Comments
Post a Comment