আগুনে পুড়ে যাওয়া মনুষ্যত্ব
দিপু চন্দ্র দাসের অপরাধটাই বা কী ছিল? আচ্ছা, যাক, ধরে নিলাম দিপু চন্দ্র দাস অনেক বড় অপরাধী। কিন্তু তাও কি তাকে এভাবে মারা যায়? অথচ এখানে দিপু একজন নিরীহ মানুষ। আপনারা তাকে ইসলাম ধর্মে কটূক্তির অভিযোগে মেরে ফেললেন? ধরে নিলাম সে কটূক্তি করেছিল, তবু আমাদের দেশে তো ব্লাসফেমি আইন আছেই ( যদিও এই আইন কোন সময় মেজরিটেরিয়ান দের উপর প্রয়োগ হতে দেখলাম না)। আপনারা চাইলে তাকে পুলিশের হাতে আইনের আওতায় সোপর্দ করতে পারতেন।
আপনাদের খোদা আর নবী কি বলেছেন, এভাবে তাদের বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীদের হত্যা করতে? কিন্তু রাসুল (সা.) যখন ইসলাম প্রচার করছিলেন, মক্কার অনেক অমুসলিম ও অবিশ্বাসী তার ওপর কত অত্যাচার, অপমান করেছিল,পাথর নিক্ষেপ করেছিল, এ কথা তো মুটামুটি ইসলাম পালনকারীদের জানারই কথা। কিন্তু রাসুল(সাঃ) তো কোন সময় একবার ফিরে তাদের খারাপ কথা বলা তো দুরে থাক, অভিশাপও দেননি। মক্কা বিজয়ের পর তিনি চাইলে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তা না করে সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তাহলে আপনারা কার উম্মত? কার আদর্শে বিশ্বাস করেন?
আচ্ছা, ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাত সব বাদ দিলাম, আপনারা কি একজন মানুষকেও দেখলেন না? একটি কুকুর বা বিড়ালকে পিটিয়ে মারলেও তা অমানবিক শোনায়, আর আপনারা একজন জলজ্যান্ত মানুষকেই ফেললেন। দিপু দাস মুসলিম হলে কি বেঁচে যেত? হয়তো, হয়তো না। আমাদের দেশের মানুষই তো ছেলে-ধরা গুজবে এক স্কুলের অভিভাবককে দিনের আলোয় পিটিয়ে মেরেছিল...হায়রে আমার দেশের মানুষ!
আর দ্বিতীয় ছবিটি হলো, দিপু চন্দ্র দাস হাসিমুখে দাঁড়ানো, পাশে তার স্ত্রী, আর তার কোলে তার ছোট্ট মেয়ে। এই ছবিটিও এখন খুবই হৃদয়বিদারক মনে হয়। তার পরিবারের কেউ কি জানত, যে মানুষটি একটু আগে ঘর থেকে বের হলো, সে রাতে ফিরবে একটি জ্বলন্ত লাশ হয়ে? একজন একেবারেই নিরাপরাধ মানুষ। আর তাকে মারল কারা? তার আশেপাশের মানুষজন, আমাদের আশেপাশের মানুষজন।
দিপু দাসের সন্তানকে রাষ্ট্র কী জবাব দেবে? তার বাবা কেন মারা গেল? সে যখন বড় হবে, যখন জানবে তার বাবাকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তখন তার ভেতর দিয়ে কী যাবে? তার স্ত্রী, তার মা–বাবাকে কী জবাব দেবে রাষ্ট্র? আর আমরাই বা কী জবাব দেব? আমরাই বা আর কীভাবে বলব যে এই দেশে ভিন্ন ধর্মের মানুষও নিরাপদ?
ওসমান হাদি যেদিন মারা গেল, সেদিন দিপু চন্দ্রও তো মারা গিয়েছিল। কিন্তু হাদির জন্য যেভাবে পুরো দেশ এক হয়েছে, দিপুর জন্য তো তা দেখলাম না। কেন? দিপু চন্দ্র সাধারণ মানুষ বলে? গরিব শ্রমিক বলে? নাকি হিন্দু বলে? ওসমান হাদির পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিয়েছে, তার সন্তানের খরচও রাষ্ট্র বহন করবে। দিপু চন্দ্র দাসের পরিবারের দায়িত্ব কি রাষ্ট্র নেবে? এই প্রশ্ন ইন্টেরিম সরকারের কাছেই।
যদিও এই ইন্টেরিম সরকারের কাছে প্রশ্ন করে খুব একটা লাভ নেই। পুরোপুরি ব্যর্থ ইউনূস সরকার এসব সামাল দিতে। জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন ছিল, তার চেয়ে উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। দেশটা মবের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। আর ইউনূস সরকার, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও সেনাবাহিনী কী এমন কাজে ব্যস্ত যে এত দিনেও মব নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না?
দুঃখজনক হলেও সত্য, জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশে যে র্যাডিকালিজমের উত্থান দেখা গেছে, তার বিস্তার বরং আরও বেড়েছে। ‘তৌহিদি জনতা’ নামের যে মব গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে, সরকার তা দমনে কী পদক্ষেপ নিয়েছে? ময়মনসিংহের ঘটনাটি যে এই গোষ্ঠীর মোডাস অপারেন্ডি দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়, সে কথাও তো বলা যায় না।
এইসবের মধ্যে ইউনূসের কাজ যেন খালি কোনো ঘটনা ঘটার পর একটি দুঃখজনক বিবৃতি দেওয়া এবং অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছে বলে আশ্বাস দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ। অথচ এই অপরাধীরা দুই দিনের মধ্যে জামিন পাবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুষ্ঠু বিচার কি আদৌ পাবে দিপু বা হাদি?
আমরা জাতি হিসেবেই খুব নিখৃষ্ট। এসব মবের গড্ডালিকায় আমরা সহজেই গা ভাসিয়ে দিই। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, উদীচীর হাদির মৃত্যুর সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ছিল না, তবু এসব প্রতিষ্ঠানে হামলা কেন হলো? ডেইলি স্টারের ভবনে আগুনে যাদের দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর উপক্রম হয়েছিল, তাদের দোষ কী? তারাও তো হাদির মতোই মানুষ।
আর তাদের সাহায্যের পোস্টে হাসির রিয়্যাক্ট দেখে তো এটাই মনে হয়, আমরা কি আদৌ মানুষ? আমাদের সহনশীলতা এতটাই কমে গেছে যে মুক্তচর্চা, গান, সংস্কৃতি, সবকিছুর সঙ্গেই এখন আমাদের সমস্যা। আসলে ওইসব আগুনে আমাদের মনুষ্যত্বেরই মৃত্যু হয়েছে। "এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি...." , না, চাই না তো এমন কোন দেশ খুঁজে পেতে, যে দেশে মানুষের মনুষ্যত্ব মৃত!

Comments
Post a Comment